দেড় বছরে পণ্যবাহী ১৫ জাহাজডুবি

নওয়াপাড়া নৌবন্দর দিয়ে পণ্য সরবরাহের চাহিদা বাড়ছে কমছে ব্যবহার উপযোগিতা

যশোরের অভয়নগরে অবস্থিত নওয়াপাড়া নৌবন্দর দিয়ে প্রতি বছরই পণ্য সরবরাহের চাহিদা বাড়ছে।

যশোরের অভয়নগরে অবস্থিত নওয়াপাড়া নৌবন্দর দিয়ে প্রতি বছরই পণ্য সরবরাহের চাহিদা বাড়ছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে সরকারের রাজস্ব আয়ও। কিন্তু নাব্য সংকট, সরু চ্যানেলসহ নানা কারণে ব্যবহার উপযোগিতা হারাচ্ছে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের সবচেয়ে বড় ও ব্যস্ততম এ নদীবন্দর। গত দেড় বছরে এখানে ১৫টির বেশি পণ্যবাহী জাহাজডুবির ঘটনা ঘটেছে।

নওয়াপাড়া নৌবন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এ নৌবন্দরে ১ হাজার ৬১৩টি জাহাজে ৭ লাখ ৬ হাজার ৮১৩ টন পণ্য এসেছে। এ থেকে সরকার ২ কোটি ৬৫ লাখ ৮৯ হাজার ১৮৬ টাকা রাজস্ব পেয়েছে। এর আগে ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১ হাজার ৫৮৪টি জাহাজে এসেছে ৬ লাখ ৯২ হাজার ৩১৩ টন পণ্য। এ সময় রাজস্ব আয় করেছে ২ কোটি ৪২ লাখ ২২ হাজার ৮৭৫ টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরে ১ হাজার ৩৭৫টি জাহাজে পণ্য এসেছে ৫ লাখ ৯০ হাজার ২২০ টন। এ থেকে সরকার রাজস্ব আদায় করেছে ২ কোটি ৪০ লাখ ৮২ হাজার ৬৪৪ টাকা। ২০২০-২১ অর্থবছরে ১ হাজার ২০৫টি জাহাজে পণ্য এসেছে ৫ লাখ ৩৮ হাজার ৯২০ টন। রাজস্ব আয় হয়েছে ২ কোটি ৩৪ লাখ ৪২ হাজার ৩০০ টাকা।

পণ্যবাহী জাহাজের মালিক, শ্রমিকসহ সংশ্লিষ্টরা জানান, সড়ক, রেল ও নদীপথে ভালো যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে নব্বই দশকের শুরুতে নওয়াপাড়ায় ব্যাপক প্রসার ঘটে সার, খাদ্যশস্য ও সিমেন্ট ব্যবসার। ফলে বন্দরটি পরিণত হয় দেশের অন্যতম বড় বিপণন কেন্দ্রে। কিন্তু প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাব, নাব্য সংকট, সরু চ্যানেলসহ নানা কারণে বন্দরটি ব্যবহার উপযোগিতা হারাচ্ছে। মূলত নিয়মিত খনন না করায় নৌবন্দরে ভৈরব নদের নাব্য সংকট দিন দিন প্রকট হচ্ছে। খননকাজ সুষম বা ধারাবাহিকভাবে করা হয় না। কোথাও গভীর আবার কোথাও মোটেও খনন করা হয়নি। পাশাপাশি দখলের কারণে ভৈরব নদ দিন দিন সরু হয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে অদক্ষ মাস্টাররা মূল চ্যানেলের বাইরে এসে নদের কিনারায় জাহাজগুলো নোঙর করেন। এছাড়া সময়মতো মেরামত না করায় পণ্যের অতিরিক্ত ওজনের চাপ সহ্য করতে না পেরে পুরনো জাহাজের তলা ফেটে তা পানিতে তলিয়ে যায়।

জানা গেছে, গত ৯ ফেব্রুয়ারি শুভরাড়া এলাকায় ৮৫০ টন ইউরিয়া সারবোঝাই এমভি সেভেন সিজ-৪ নামের একটি কার্গো জাহাজতলা ফেটে ডুবে যায়। এর আগে গত বছরের ১৩ এপ্রিল নওয়াপাড়া নোনাঘাট এলাকায় ভৈরব নদের ঘাটে এমভি সাকিব বিভা-২ নামে একটি জাহাজডুবির ঘটনা ঘটে। একই বছরের ২৫ জানুয়ারি সিদ্দিপাশায় গমবোঝাই এমভি ওয়েস্টার্ন-২ কার্গো জাহাজ কাত হয়ে ডুবে যায়। এ সময় জাহাজে প্রায় ৭০০ টন গম ছিল। এছাড়া গত বছরের ১৫ ডিসেম্বর ৮২০ টন কয়লাসহ এমভি আর রাজ্জাক, ১৩ এপ্রিল ৬৮৫ টন কয়লাবোঝাই এমভি সাকিব বিভা-২, ১৫ জানুয়ারি প্রায় ৮০০ টন কয়লাবাহী এমভি পূর্বাঞ্চল-৭ ও ১৩ জানুয়ারি ৭০০ টন কয়লা নিয়ে এমভি মৌমনি-১ কার্গো জাহাজতলা ফেটে ডুবে যায়।

বন্দর ব্যবহারকারীদের অভিযোগ, ভৈরব নদে আগের তুলনায় জাহাজের সংখ্যা বাড়লেও নোঙর করার জায়গা খুবই কম। পানি কম থাকায় দুর্ভোগে পড়তে হয়। নওয়াপাড়া নদীবন্দর সচল ও নিরাপদ রাখতে নিয়মিত নদীখনন ও নিরাপদ জেটি নির্মাণের দাবি দীর্ঘদিনের।

খুলনা নৌ-পরিবহন মালিক সমিতির কোষাধ্যক্ষ চৌধুরী মিনহাজ উজ জামান সজল বলেন, ‘দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সব থেকে বড় নদীকেন্দ্রিক অর্থনীতির কেন্দ্র নওয়াপড়া বন্দরের বেহাল অবস্থা দীর্ঘদিনের। নদীর নাব্যতা কম। পানি কমতে কমতে নদী ছোট হয়ে আসছে। সঠিক পদ্ধতিতে ড্রেজিং করার প্রয়োজনীয়তার কথা আমরা বারবার বলেছি। তবে এর সমাধান হচ্ছে না।’

নওয়াপাড়া সার ও খাদ্যশস্য ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক শাহ জালাল হোসেন বলেন, ‘ভৈরব নদকে ঘিরে নওয়াপাড়ার ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটেছে। আমরা ঠিকমতো ট্যাক্স দিচ্ছি। কিন্তু নদীবন্দরের কোনো উন্নয়ন হচ্ছে না। এখানে ছোট জাহাজ এলেও ঘাটে ভিড়তে পারে না। এজন্য আমরা গাইড ওয়াল নির্মাণের দাবি করেছিলাম। কিন্তু তা করা হয়নি।’

এ বিষয়ে নওয়াপাড়া নদীবন্দরের উপপরিচালক মো. মাসুদ পারভেজ বলেন, ‘সব নদ-নদীতে নাব্য সংকট রয়েছে। ভৈরব নদে ড্রেজিং চলছে। মূলত অদক্ষ মাস্টার-ড্রাইভার নিয়ম না মেনে জাহাজগুলো মূল চ্যানেলের বাইরে এসে নদের কিনারায় নোঙর করেন। তাছাড়া পুরনো জাহাজের তলদেশ নিয়মিত ডকিং বা মেরামত না করায় অতিরিক্ত পণ্যের চাপে ভাটায় এসব জাহাজ দুর্ঘটনায় পড়ছে।’

তবে বন্দরের উন্নয়নে নানা পরিকল্পনার কথা জানিয়ে এ কর্মকর্তা বলেন, ‘নওয়াপাড়া নদীবন্দরটি নিয়ে সরকার অনেক কাজ করেছে। সামনে আমাদের বড় ধরনের পরিকল্পনা রয়েছে। এরই মধ্যে প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এটি বাস্তবায়ন হলে আরো বেশি জাহাজ ভিড়তে পারবে।’

আরও